জেনে নিন রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর উপায়

রক্তকোষে লৌহসমৃদ্ধ একধরনের প্রোটিন হচ্ছে হিমোগ্লোবিন। রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ অনেকেরই কম থাকে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে এই সমস্যাটি নিয়ে কেউ তেমন সচেতন নন, তবে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ক্রমশ কমতে থাকলে বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

হিমোগ্লোবিন কী?

রক্তের মাধ্যমে সমগ্র দেহে অক্সিজেন ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পরিবাহিত হয়ে থাকে। রক্তের তিনটি কণিকার মধ্যে লোহিত কণিকায় থাকে বিশেষ ধরনের আয়রন যাকে হিমোগ্লোবিন বলা হয়। এই হিমোগ্লোবিনের প্রধান কাজ হচ্ছে ধমনী থেকে দেহের সব জায়গায় অক্সিজেন সরবরাহ করা। দেহে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে দেহে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পরে, মাথা ব্যথা ও অন্যান্য নানা রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। সুতরাং আমাদের প্রত্যেকেরই রক্তে যথেষ্ট পরিমাণ হিমোগ্লোবিন থাকা চাই।এমনকি দীর্ঘদিন রক্ত স্বল্পতায় ভুগলে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহ সম্পূর্ণ বিকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সম্প্রতি এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে প্রাকৃতিক উপায়ে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ানোর উপায় বর্ণনা করা হয়েছে।জেনে নিন হিমোগ্লোবিন বাড়বে এমন কয়েকটি খাবার সম্পর্কে-

বাদাম: যে কোনো ধরনের বাদাম মানবদেহের জন্য উপকারী বলে বিবেচিত হয়। যে কারণে তরুণদের কাজু বাদাম, চিনা বাদাম এবং আখরোট খেতে বলা হয়। এতে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ে।

মাংস: রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়াতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রোটিন। এজন্য সব ধরনের লাল মাংস যেমন- গরু ও খাসির মাংস খেতে হবে। কলিজা আয়রনের সবচেয়ে ভালো উৎসগুলোর মধ্যে একটি। আয়রন হিমোগ্লোবিন বাড়াতে সাহায্য করে। মুরগির মাংস লাল না হলেও তা দেহকে অনেক আয়রন সরবরাহ করে থাকে।

টকজাতীয় ফল: রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ায় সব ধরনের রসালো সাইট্রিক ফল। ভিটামিন সি এর সবচেয়ে ভালো উৎস আম, লেবু এবং কমলা। দেহের আয়রন শুষে নেয়ার জন্য ভিটামিন সি সবচেয়ে জরুরি। স্ট্রবেরি, আপেল, তরমুজ এবং বেদানাতেও প্রচুর পরিমাণে আয়রন রয়েছে।

সামুদ্রিক মাছ: এতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন এবং অন্যান্য পুষ্টির উপাদান আছে। অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতায় শিকার রোগীদের প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ রাখতে হবে।

সয়াবিন: ছোলা বা সয়াবিন জাতীয় খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। সয়াবিন বর্তমানে রোগীদের জনপ্রিয় একটি খাবার। এ থেকে সুস্বাদু সব খাবার তৈরি হয় এবং এটা রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ায়।

পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার: চাল, গম, বার্লি এগুলো রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। এসব খাবার প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেড সরবরাহ করে থাকে। বিশেষ করে, লাল চাল সববয়সী রোগীদের জন্য আয়রনের বিশেষ উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়।

শুকনো ফল: কিসমিস ও খেজুরে আছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন এবং আঁশ। এসব খাবার খেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ে দ্রুত গতিতে।

ডিম: আমিষ জাতীয় খাদ্যের মধ্যে ডিম অন্যতম। এতে রয়েছে আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। ডিমের কুসুমে আছে খনিজ পুষ্টি ও ভিটামিন। এ কারণে দুর্বল রোগীদের প্রতিদিন সিদ্ধ ডিম খেতে বলা হয়।

ডার্ক চকলেট: প্রচুর পরিমাণে আয়রন রয়েছে ডার্ক চকলেটে। দেহে আয়রনের ঘাটতি মেটায় এটি। যার ফলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও দ্রুতগতিতে বেড়ে যায়।

সবজি: প্রতিদিন তাজা সবজি খেলে আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান এবং নানা ধরনের ভিটামিনের ঘাটতি মিলবে। আলু, কপি, টমেটো, কুমড়া এবং লেবু আয়রনের ঘাটতি মেটাতে সক্ষম।

রক্তকোষে লৌহসমৃদ্ধ একধরনের প্রোটিন হচ্ছে হিমোগ্লোবিন। এটি শরীরে অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে। সুস্থ জীবনযাপনে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা সঠিক থাকা প্রয়োজন। কিছু খাবার খেয়ে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মান ঠিক রাখা যায়। ভারতের ফর্টিস হাসপাতালের চিকিৎসক মনোজ কে আহুজার মতে, রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথায় ঝিম ধরা, ক্ষুধামান্দ্য ও দ্রুত হৃৎস্পন্দনের মতো সমস্যা দেখা যায়। যদি হিমোগ্লোবিনের মাত্রা অনেক কম হয়, তবে রক্তস্বল্পতা বা এর চেয়েও মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসক আহুজার মতে, “সবার লৌহের দরকার হয়। তবে নারীদের ঋতুচক্রের সময়, গর্ভাবস্থায়, শিশুদের বেড়ে ওঠার সময়, রোগ থেকে সেরে ওঠার মুহূর্তে লৌহের বেশি দরকার হয়।”

লৌহযুক্ত খাবার

শরীরে লৌহের ঘাটতি হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে লোহা গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। লৌহসমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে মুরগির কলিজা, ঝিনুক, ডিম, আপেল, বেদানা, ডালিম, তরমুজ, কুমড়ার বিচি, খেজুর, জলপাই, কিশমিশ ইত্যাদি।

ভিটামিন সি

ভিটামিন সি-এর অভাবে হিমোগ্লোবিন কমে যেতে পারে। তা ছাড়া ভিটামিন সি ছাড়া লোহা পুরোপুরিভাবে শোষণ হয় না। পেঁপে, কমলা, লেবু, স্ট্রবেরি, গোলমরিচ, সবুজ ফুলকপি (ব্রকোলি), আঙুর, টমেটো ইত্যাদিতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে।

ফলিক অ্যাসিড

ফলিক অ্যাসিড একপ্রকার ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। এটি লাল রক্তকণিকা তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপাদান। সবুজ পাতাযুক্ত সবজি, কলিজা, ভাত, শিমের বিচি, বাদাম, কলা, সবুজ ফুলকপিতে অনেক ফলিক অ্যাসিড পাওয়া যায়।

আপেল

দিনে একটি করে আপেল খেয়ে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক রাখতে পারেন। আয়রনের উৎস আপেলে আরও নানা প্রকার পুষ্টি উপাদান রয়েছে। প্রতিদিন খোসাসহ একটি আপেল খান। অথবা সমানুপাতে আপেল ও বিটের রস মেশাতে পারেন।

ডালিম

আয়রন, ক্যালসিয়াম, শর্করা ও আঁশ (ফাইবার) সমৃদ্ধ ডালিম রক্তে হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি করে দেহে রক্ত চলাচল সচল রাখে। প্রতিদিন মাঝারি আকৃতির একটি ডালিম খাওয়ার চেষ্টা করুন। অথবা এক গ্লাস ডালিমের জুস খান।

বিট

হিমোগ্লোবিন বাড়াতে বিটের রস খাওয়ার পরামর্শ দেন ডাক্তাররা। এতে রয়েছে প্রচুর আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ফাইবার ও পটাশিয়াম।